জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেছেন, কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের মুখে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করতে চায় না। জনগণের প্রয়োজন ও জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় একনেক সভায় অনুমোদিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারের অগ্রাধিকার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি প্রকল্প যাচাই-বাছাই, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোনো প্রকল্প বড় না ছোট—এটি মূল বিবেচ্য বিষয় নয়; বরং প্রকল্পটি জনগণের প্রয়োজন কতটা পূরণ করছে এবং জাতীয় উন্নয়নে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একনেকে ১৩ প্রকল্প অনুমোদন
এদিনের একনেক সভায় মোট ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১টি নতুন প্রকল্প এবং দুটি চলমান প্রকল্পের সংশোধনী রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা, প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা, গ্রামীণ অবকাঠামো, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নগর উন্নয়ন, জ্বালানি এবং পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫)-এ। এ কর্মসূচিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একাধিক কার্যক্রমকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার কারণেই এ কর্মসূচির আকার বড় হয়েছে বলে তিনি জানান।
গ্রামীণ যোগাযোগ ও অবকাঠামোয় গুরুত্ব
গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৪৭৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে যানবাহন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি পৃথক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশেষায়িত যানবাহন কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং পরিচালন যানবাহন কেনার জন্য ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন সময়ে পুলিশের বেশ কিছু যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে।
নিরাপদ পানি ও নগর উন্নয়ন
বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত এটি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণ, নালা নির্মাণ ও পুনঃখননের জন্য ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিতাসে নতুন গ্যাসকূপ
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ—তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩—খননের প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড।
‘জনগণের প্রয়োজনই প্রকল্পের মূল ভিত্তি’
একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বড় প্রকল্প গ্রহণ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বড় না ছোট—সেটি সরকারের কাছে মূল বিষয় নয়। জনগণের প্রয়োজন এবং জাতীয় উন্নয়নে প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করেই তা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার পাশাপাশি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। জনগণের প্রয়োজন পূরণ করে এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
Thedailyglobalnation