মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের ডুমুরশিয়া ডি.সি. মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ১০৬তম লাঠিখেলা। শত বছরের পুরোনো এ আয়োজন দেখতে মহম্মদপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী শালিখা, শ্রীপুর, বোয়ালমারী ও মধুখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন হাজারো নারী-পুরুষ। নারী ও শিশুদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
কার্তিক মাস এলেই ডুমুরশিয়ার মানুষের মধ্যে শুরু হয় এই আয়োজনের অপেক্ষা। বছরের একটি দিনকে ঘিরে মাঠ ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। লাঠিখেলার পাশাপাশি বসে গ্রামীণ মেলা। নানা ধরনের পণ্য, খাবারের দোকান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনকে ঘিরে সরগরম হয়ে ওঠে ডুমুরশিয়া বাজার।
লাঠির কসরতে মুগ্ধ দর্শক
বিকেলে নির্ধারিত সময়ে মাঠে নামেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লাঠিয়াল দলের সদস্যরা। বর্ণিল পোশাকে হাতে লাঠি নিয়ে শুরু করেন একের পর এক কৌশল প্রদর্শন। ঢাক-ঢোল ও বাঁশির তালে লাঠির দ্রুত ঘূর্ণন, আক্রমণ ও প্রতিরোধের দৃশ্য মুহূর্তেই দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।
এক দলের আক্রমণ দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করে পাল্টা কৌশল দেখান অন্য দলের লাঠিয়ালরা। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে লাঠির ঝনঝনানি। প্রতিটি কৌশলের পরই দর্শকদের করতালি ও উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
আধুনিক সময়ে ক্রিকেট, ফুটবল ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের জনপ্রিয়তা বাড়লেও এই আয়োজন প্রমাণ করেছে—গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের টান এখনও অটুট।
সময় বদলেছে, হারিয়ে যাচ্ছে লাঠিয়ালদের দল
একসময় গ্রামবাংলার অন্যতম প্রধান বিনোদন ছিল লাঠিখেলা। শুধু বিনোদন নয়, অনেক পরিবার এ খেলাকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন গ্রামে নিয়মিত বসত লাঠিখেলার আসর। তবে সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক বিনোদনের প্রসার এবং পর্যাপ্ত আয়োজনের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্য।
লাঠিয়াল দলের প্রধান মানিক সরদার বলেন, ছোটবেলা থেকেই পূর্বপুরুষদের লাঠিখেলা দেখে তাঁর এ খেলায় আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই এখনও তিনি ঐতিহ্যটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, আগের মতো এখন আর সর্বত্র লাঠিখেলার আয়োজন হয় না। তবে ডুমুরশিয়ায় প্রতিবছর এই আয়োজন হওয়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
ঐতিহ্য রক্ষায় স্থানীয়দের উদ্যোগ
ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির উদ্যোগে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এ লাঠিখেলার। আয়োজকদের উদ্দেশ্য শুধু দর্শকদের বিনোদন দেওয়া নয়; বরং হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর পরিচয় তুলে ধরা।
আয়োজক কমিটির সভাপতি ও ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, নতুন লাঠিয়াল দল তৈরি করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক জায়গায় এ ধরনের আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তবে লাঠিয়ালদের মধ্যে এখনও ঐতিহ্য ধরে রাখার আগ্রহ রয়েছে। সেই আগ্রহকে উৎসাহিত করতেই প্রতিবছর ডুমুরশিয়ায় এই আয়োজন করা হচ্ছে।
লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের আহ্বান
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী-এমপি। তিনি বলেন, লাঠিখেলা গ্রামবাংলার অত্যন্ত প্রাচীন ও জনপ্রিয় একটি খেলা। লাঠিখেলার পাশাপাশি হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা ও নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে রয়েছে হাজারো ধরনের গ্রামীণ সংস্কৃতি। লাঠিখেলা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা থেকে আসা কবি হাফিজ রহমান ও কবি সাদী মোহাম্মদ বলেন, ক্রিকেট ও ফুটবলের জনপ্রিয়তার চাপে লাঠিখেলা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অথচ ষাটের দশক থেকে গ্রামবাংলায় এ খেলার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। পুরোনো এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সরকারেরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
ঐতিহ্যের টানে মিলনমেলা
শুক্রবার দিনভর ডুমুরশিয়ায় ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি। বিকেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাঠিখেলার মাঠে বাড়তে থাকে দর্শকের চাপ। ঢাকের তালে লাঠিয়ালদের কসরত, দর্শকদের করতালি আর মেলার আনন্দ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবের মাঠে।
একদিকে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রয়াস, অন্যদিকে হাজারো মানুষের নির্মল আনন্দ—সব মিলিয়ে ডুমুরশিয়ার ১০৬তম লাঠিখেলা হয়ে উঠেছে লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত মিলনমেলা। আধুনিকতার ভিড়ে পুরোনো ঐতিহ্য যখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এমন আয়োজন যেন নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—বাংলার মাটিতে এখনও বেঁচে আছে শেকড়ের সেই গল্প।
Md Alamin Shaikh